স্ত্রী নিজে তালাক দিলে কি ভরণপোষণ বন্ধ হয়ে যায়?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “স্ত্রী নিজে তালাক দিলে কি ভরণপোষণ বন্ধ হয়ে যায়?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

“তুমি নিজে তালাক দিয়েছ, এখন আবার কিসের ভরণপোষণ আর দেনমোহর?”

স্বামীর চরম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফারিয়া অবশেষে তার কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা বলে স্বামীকে তালাক নোটিশ পাঠান। তালাকের পর যখন তিনি তার বকেয়া ভরণপোষণ এবং দেনমোহর চাইলেন, তখন শ্বশুরবাড়ি ও সমাজের একাংশ তাকে বলতে শুরু করল— “তালাক তো তুমি নিজে দিয়েছ, স্বামী তো তোমাকে তাড়িয়ে দেয়নি। তাই আইন অনুযায়ী তুমি একটা টাকাও পাবে না।”

ফারিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে গিয়ে তিনি কি সত্যিই সব আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন? এই চাতুরীতে পরে অনেক নারী নিজের প্রাপ্য আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েন প্রতিনিয়ত। চলুন আজ বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

আইনগত ব্যাখ্যা: তালাকের ধরন এবং ভরণপোষণের অধিকার

বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, স্ত্রী তালাক দিলেই তার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। তবে তালাকটি কোন পদ্ধতিতে হচ্ছে, তার ওপর অধিকারের বিষয়টি নির্ভর করে:

১. তালাক-ই-তাফউইজ বা তালাক-ই-তৌফিজ (স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা): সাধারণত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিবাহে, অধিকাংশ কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়।

স্ত্রী যদি এই ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বামীকে তালাক দেন, তবে আইনের চোখে এটি সাধারণ তালাকের মতোই গণ্য হবে। এই ক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ইদ্দতকালীন ৩ মাস বা সন্তান জন্ম হওয়া পর্যন্ত ভরণপোষণ স্ত্রী আইনত পাবেন। এমনকি তার সম্পূর্ণ দেনমোহরও স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য।

২. খোলা তালাক বা খুলা (Khula): এটি একটি বিশেষ পদ্ধতি যেখানে স্ত্রী কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে স্বামীর সম্মতিতে বিচ্ছেদ চান। সাধারণত খুলা তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী তার দেনমোহর বা ভরণপোষণের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ মওকুফ বা ত্যাগ করতে রাজি হয়ে বিচ্ছেদ নেন। অর্থাৎ, স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় চুক্তির মাধ্যমে অধিকার ছেড়ে দেন, কেবল তখনই তিনি তা পাবেন না।

৩. স্বামী তালাক দিলে: স্বামী তালাক দিলেও নিয়ম একই। তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বকেয়া ভরণপোষণ, ইদ্দতকালের খরচ এবং সম্পূর্ণ দেনমোহর স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিতে হবে।

৪. সন্তানের ভরণপোষণ সম্পূর্ণ আলাদা: স্ত্রী যেভাবে বা যে পদ্ধতিতেই তালাক দিন না কেন, সন্তানের ভরণপোষণের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ে না। সন্তান মায়ের কাছে থাকলে তার যাবতীয় খরচ বাবাকেই (মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের আগ পর্যন্ত এবং ছেলের ক্ষেত্রে ১৮ বছর পর্যন্ত) দিয়ে যেতে হবে।

ফারিয়ার মতো নারীদের অবগতির জন্য বলছি, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম ব্যবহার করে তালাক দিন আর স্বামী তালাক দিন, কোনভাবেই আপনার দেনমোহর বা ভরণপোষণের অধিকার নষ্ট হয় না। আইন আপনাকে নিজের সুরক্ষার অধিকার দিয়েছে, তাই ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হবেন না।

Share the Post:
Scroll to Top