“তুমি সন্তানের মুখ আর কখনও দেখতে পাবে না!” অথবা “আমার সন্তানকে আমি তোমার কাছে যেতে দেব না!” স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর এমন কথাগুলো প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই লড়াইয়ে আসল ক্ষতিগ্রস্ত কে?
সিংহভাগ ক্ষেত্রে উত্তরটি হলো, ‘সন্তান’।
অতি সম্প্রতি আমার দেখা একটি বাস্তব ঘটনা শুনুন। বিবাহবিচ্ছেদের পর এক দম্পতি তাদের সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। মা মনে করেন, বাবা সন্তানের জীবনে থাকার অধিকার হারিয়েছেন। অন্যদিকে বাবা মনে করেন, সন্তানের ওপর তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ফলে সন্তানের সামনে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অপবাদ ও বিরূপ মন্তব্য চলতেই থাকে।
কয়েক বছর পর দেখা গেল, শিশুটি পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছে, আত্মবিশ্বাস কমে গেছে, এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে। অথচ মা-বাবা দুজনেই দাবি করছিলেন যে তারা সন্তানের মঙ্গলই চান। এখানেই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন— পিতামাতার জেদ অনেক সময় সন্তানের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশের পারিবারিক আদালত এবং উচ্চ আদালত বারবার একটি নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ (Best Interest of the Child)। আদালত সাধারণত মা বা বাবার ব্যক্তিগত জেদ, রাগ বা প্রতিশোধের মনোভাবকে গুরুত্ব দেয় না; বরং বিবেচনা করে— সন্তানের মানসিক সুস্থতা, শিক্ষার পরিবেশ, শারীরিক নিরাপত্তা, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশ এবং পিতামাতার সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ; ইত্যাদি।
অনেকেই মনে করেন, সন্তানের অভিভাবকত্বের মামলা মানেই একজনের জয় এবং অন্যজনের পরাজয়। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। আদালতের লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত না হয়।
বিশেষ করে সন্তানের সামনে পিতা বা মাতাকে অপমান করা, যোগাযোগে বাধা দেওয়া, মিথ্যা অভিযোগ তোলা বা সন্তানকে বিরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা —এসব আচরণ দীর্ঘমেয়াদে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তান কোনো সম্পত্তি নয়, যে তাকে নিয়ে টানাটানি করা যাবে। সন্তান একটি স্বতন্ত্র মানুষ, যার অনুভূতি, ভয়, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ আছে।
তাই সম্পর্ক ভেঙে গেলেও দায়িত্ব ভাঙে না। একজন ভালো মা বা ভালো বাবা হওয়ার প্রথম শর্ত হলো— নিজের জেদের আগে সন্তানের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া। মনে রাখবেন, ইতিমধ্যেই আপনার নিজের স্বার্থের বলী হয়ে পড়েছে আপনারই রক্ত-মাংসের সন্তান। তাকে আর ভাসিয়ে দিয়েন না!
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ: সন্তানের অভিভাবকত্ব, তত্ত্বাবধান বা সাক্ষাতের অধিকার (Visitation Rights) সংক্রান্ত বিষয়ে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। কারণ আইন সবার জন্য একই হলেও প্রতিটি পরিবারের বাস্তবতা ভিন্ন। উপরোক্ত আলোচনা সাধারণ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কী প্রতিকার বা আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, তা নির্ভর করবে ঘটনার প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপটের ওপর।
মনে রাখবেন— সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায় হলো, মা-বাবার বিরোধের ঊর্ধ্বে তার কল্যাণকে স্থান দেওয়া।