“সংসার ভাঙার ভয়ে মুখ বুজে সহ্য করছি, কিন্তু স্বামী যদি গোপনে আরেকটা বিয়ে করে ফেলে তবে কি আমার কিছুই করার নেই?” – এটি আমাদের সমাজের হাজারো অবহেলিত স্ত্রীর এক নীরব জিজ্ঞাসা।
অনেকেই মনে করেন, স্বামী গোপনে বিয়ে করে ফেললে প্রথম স্ত্রীর আর কোনো আইনি অধিকার থাকে না বা সেই বিয়ে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু বাংলাদেশের আইন প্রথম স্ত্রীকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং অসাধু চক্রকে শাস্তি দেওয়ার স্পষ্ট অধিকার দিয়েছে।
আমার চেম্বারে আসা এক নারীর ঘটনা বলি। তার স্বামী ব্যবসার অজুহাতে প্রায়শই পার্শ্ববর্তী একটি এলাকায় যাতায়ত করতো। মাধে মধ্যেই সেই এলাকায় রাত্রি যাপন করতো। তার স্ত্রীর মনে ‘স্বামী হয়তো পরকীয়া করছে’ এমন খটকা থাকলেও ব্যবসার গুরুত্ব বুঝে তিনি কিছু বলার সাহস পাননি।
এর কিছুদিন পরের ঘটনা। প্রথম স্ত্রীর অজ্ঞাতে তার কোনো অনুমতি ছাড়াই সেই এলাকায় তার স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এক প্রভাবশালী কাজীর মাধ্যমে ভুয়া তথ্য দিয়ে এই বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জানার পর ভেঙে না পড়ে আইনি পরামর্শ নেন।
আমরা যখন যথাযথ প্রমাণসহ আদালতের দ্বারস্থ হলাম, তখন সেই গোপন বিয়ের আইনি ভিত্তি তো নড়বড়ে হলোই, সাথে সাথে সেই জালিয়াতির সাথে যুক্ত কাজীকেও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হলো।
আইনগত ব্যাখ্যা: স্ত্রী কি বিয়ে বাতিল চাইতে পারেন এবং কাজীর শাস্তি কী?
বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী পরকীয়া যেমন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তেমনি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা আইনত দণ্ডনীয়। এর খুঁটিনাটি আইনি দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. স্ত্রী কি বিয়ে বাতিল চাইতে পারেন?
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। যদি স্বামী এই আইন অমান্য করে গোপনে বিয়ে করেন, তবে প্রথম স্ত্রী পারিবারিক আদালতে গিয়ে স্বামীর শাস্তি, দেনমোহর এবং ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
যদিও মুসলিম আইনে দ্বিতীয় বিয়েটি সরাসরি বাতিল (Void) হয় না অর্থাৎ বিয়েটি বৈধ হয়, তবে রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া করায় তা সম্পূর্ণ অবৈধ (Illegal) এবং আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের ভিত্তিতে স্ত্রী চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের (তালাক) আইনি নোটিশ দিতে পারেন এবং সম্পূর্ণ দেনমোহর উসুল করতে পারেন।
২. স্বামীর শাস্তি:
এ ছাড়াও মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ আইনের বাহিরেও, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী মামলা করতে পারেন। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে স্বামীর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর বিয়ের কথা গোপন রেখে করলে ৪৯৫ ধারায় স্বামীর সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৩. অসাধু কাজীর শাস্তি কী?
কোনো কাজী যদি প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতিপত্র যাচাই না করে, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বা তথ্য গোপন করে জেনেশুনে এই ধরনের বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তবে তিনি পার পাবেন না। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী সেই কাজীর লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত হতে পারে। এছাড়া দণ্ডবিধির ধারা অনুযায়ী জালিয়াতি এবং অপরাধে সহায়তা করার অপরাধে কাজীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায়, যার ফলে তার জেল ও জরিমানা হতে পারে।
আইনজীবীর পরামর্শ: গোপন বিয়ে বা পরকীয়া কোনো হালকা বিষয় নয়। এটি প্রথম স্ত্রীর আইনি ও সামাজিক অধিকারের ওপর বড় আঘাত। তাই ঘরে অশান্তি না করে শান্ত মাথায় আইনি প্রমাণ (যেমন: দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামার নকল বা ছবি) সংগ্রহ করুন।
মনে রাখবেন, আইন সবার জন্য একই হলেও প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা ভিন্ন হয়। তাই কোনো চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপ বা মামলা করার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন। সঠিক আইনি পথই আপনার ও আপনার সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে।