তালাক বা বিচ্ছেদ মানেই কি সন্তানের জীবন থেকে মা কিংবা বাবার একজন চিরতরে হারিয়ে যাওয়া?
আমাদের সমাজে একটি বড় ভুল ধারণা আছে যে, ডিভোর্স হয়ে গেলে সন্তান যার কাছে থাকবে, অপর পক্ষের সাথে তার সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক বাবা-মা সন্তানকে অন্য পক্ষের থেকে দূরে রাখতে এক ধরণের নিষ্ঠুর লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠেন। কিন্তু আইন কখনোই একজন সন্তানকে তার মা কিংবা বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করতে চায় না।
গত সপ্তাহের একটা ঘটনা শুনুন। আমার চেম্বারে একজন মা এলেন। তিনি ভীষণ আতঙ্কে আছেন। কারণ তার প্রাক্তন স্বামী সন্তানের জিম্মা চেয়ে মামলা করার হুমকি দিচ্ছেন। মায়ের ভয়, বাবা যদি মামলা জেতেন, তবে তিনি হয়তো আর কখনোই সন্তানকে দেখতে পাবেন না।
অন্যদিকে, বাবার কষ্ট, বিচ্ছেদের পর থেকে মা তাকে সন্তানের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে দিচ্ছেন না। এই যে দুই পক্ষের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, এর মূল কারণ হলো ‘কাস্টডি’ (Custody) এবং ‘ভিজিটেশন রাইট’ (Visitation Right)-এর তফাতটা না জানা। যা, না জানাটা বা ভুল জানার ফলে আমরাই আমাদের অবস্থানকে নষ্ট করছি দিনে দিনে। চলুন আজ বিস্তারিত জানা যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: পারিবারিক আইন এবং The Guardians and Wards Act, 1890 অনুযায়ী, বিচ্ছেদের পর সন্তানের অধিকার নিয়ে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা সবার পরিষ্কারভাবে বোঝা উচিত:
১. জিম্মা বা কাস্টডি (Custody):
জিম্মা হলো সন্তান কার দৈনন্দিন তত্ত্বাবধানে বা কার বাসায় থেকে বড় হবে। আইনগত ও পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনা করে আদালত মা কিংবা বাবার যেকোনো একজনকে সন্তানের শারীরিক কাস্টডি দিতে পারেন। তবে সাধারণত মা নিদির্ষ্ট অবধি সন্তানের কাস্টডি পেয়ে থাকেন।
২. দেখাশোনার অধিকার বা ভিজিটেশন রাইট (Visitation Right):
আদালত যেকোনো এক পক্ষকে জিম্মা বা কাস্টডি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, অপর পক্ষের অধিকার শেষ হয়ে গেছে। সন্তান যার কাছেই থাকুক না কেন, অপর পক্ষ (তিনি বাবা কিংবা মা যেই হোন না কেন) সন্তানের সাথে দেখা করার, সময় কাটানোর এবং কথা বলার আইনগত অধিকার রাখেন। একেই বলা হয় ‘ভিজিটেশন রাইট’।
আদালত কীভাবে এটি নির্ধারণ করে?
যদি কোনো পক্ষ সন্তানকে অপর পক্ষের সাথে দেখা করতে বাধা দেয়, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ পারিবারিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আদালত তখন সন্তানের পড়াশোনা ও মানসিক শান্তির কথা বিবেচনা করে একটি সুন্দর শিডিউল বা সময়সূচী নির্ধারণ করে দেন।
যেমন: সপ্তাহের নির্দিষ্ট কোনো দিনে দেখা করা, ছুটির দিনে নিজের কাছে এনে রাখা কিংবা উৎসব-পার্বণে একসাথে সময় কাটানো। কারণ, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য মা এবং বাবা উভয়ের সান্নিধ্যই অপরিহার্য।
সচেতনতামূলক বার্তা: দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটলেও সন্তানের সাথে মা-বাবার সম্পর্কের অবসান ঘটে না। ইগো বা প্রতিশোধের জেরে সন্তানকে অপর পক্ষের স্নেহ থেকে বঞ্চিত করবেন না। আইন যেমন জিম্মাদারের অধিকার রক্ষা করে, তেমনি দেখাশোনার অধিকারকেও সমানভাবে গুরুত্ব দেয়।
পরামর্শ: আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও আইনি কৌশলও ভিন্ন হবে। উপরোক্ত আলোচনায়, সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো। যেকোনো সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।