তালাক হয়ে গেছে ২ বছর হলো, এখনো দেনমোহরের টাকা পাননি। অনেকেই বলছেন এখন আর মামলা করে লাভ নেই – আসলেই কি তাই?”
সুলতানা বেগমের বিচ্ছেদ হয়েছে আজ প্রায় দুই বছর। কাবিননামার ৮ লক্ষ টাকা দেনমোহর এখনো অনাদায়ী। তিনি মামলা করতে চান, কিন্তু কার কাছে যাবেন, কোথায় যাবেন — তা বুঝতে পারছেন না। পাড়ার একজন তাকে বললেন, দেওয়ানি আদালতে যেতে, আরেকজন বললেন থানায় জিডি করতে। আবার কেউ ভয় দেখালেন — “মামলা করলে বছরের পর বছর ঘুরতে হবে, কোনো লাভ হবে না।”
সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে সুলতানা বেগম চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আমাদের দেশে এমন হাজারো নারী কেবল সঠিক আইনি প্রক্রিয়া না জানার কারণে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
চলুন জেনে নেয়া যাক, দেনমোহর আদায়ের মামলা: কখন, কোথায় এবং কীভাবে করবেন?
আইনগত ব্যাখ্যা ও খুটিনাটি:
১. কখন মামলা করা যায়? (তামাদির সময়সীমা):
দেনমোহর আদায়ের মামলা করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। তামাদি আইন অনুযায়ী, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্ত্রী যদি দেনমোহর দাবি করেন এবং স্বামী তা দিতে অস্বীকার করেন — তবে অস্বীকার করার দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। আর যদি তালাক হয়ে যায়, তবে তালাক কার্যকর হওয়ার দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলা করার অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়।
২. কোথায় মামলা করতে হয়?
দেনমোহর আদায়ের মামলা কোনো থানা বা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট আদালত হলো পারিবারিক আদালত (Family Court)। সাধারণত স্ত্রী যেখানে বসবাস করেন (স্থায়ী বা অস্থায়ী ঠিকানা), সেই এলাকার সহকারী জজ আদালতই পারিবারিক আদালত হিসেবে এই মামলার বিচার করেন।
৩. মামলা করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
মামলা দায়ের করার জন্য প্রধানত যে জিনিসগুলো প্রয়োজন:
ক. মূল কাবিননামা বা নিকাহনামার সার্টিফাইড কপি।
খ. তালাক হয়ে থাকলে তালাকনামার নোটিশ এবং তা প্রাপ্তির রসিদ।
গ. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং পাসপোর্ট সাইজ ছবি। এবং
ঘ. কোনো সন্তান থাকলে তার জন্ম নিবন্ধন সনদ (যদি খোরপোষের দাবি থাকে)।
৪. মামলা চলাকালীন আপস সম্ভব কি না?
হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী, মামলা দায়েরের পর এবং চূড়ান্ত রায়ের আগে — আদালত উভয় পক্ষকে নিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা আপস-মিমাংসার (Mediation) উদ্যোগ নেন। উভয় পক্ষ সম্মত হলে আদালতের মাধ্যমেই দেনমোহরের টাকা পরিশোধের শর্তে আপসনামা বা সোলেমনামা দাখিল করে মামলা নিষ্পত্তি করা যায়।
মনে রাখবেন, আইনি প্রক্রিয়া পাহাড়সম জটিল কিছু নয়, যদি আপনি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেন। ৩ বছরের সময়সীমাটি মাথায় রাখুন এবং নিজের অধিকার আদায়ে সচেতন হোন। আইন আপনাকে অধিকার দিয়েছে, আর আদালত দিয়েছে তা বলবৎ করার সুযোগ।
আপনার জন্য পরামর্শ: একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন। কেননা, আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপন ও সমাধানও ভিন্ন হতে পারে। উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী হতে পারে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।