’দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’ মামলা কি মানসিক নির্যাতন ঠেকাতে পারে?

যেখানে কোনো মানসিক টান নেই, সেখানে কি শুধু আইনের আদেশে দুজনকে এক ছাদের নিচে আটকে রাখা যায়? নাকি জোরপূর্বক একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করা এক ধরণের প্রচ্ছন্ন মানসিক নির্যাতন?

গত মাসের একটা ঘটনা বলছি। আমার চেম্বারে এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন মা-বাবাকে সাথে নিয়ে। তার স্বামী পারিবারিক আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার’-এর মামলা করেছেন। মহিলার চোখে-মুখে এক ধরণের আতঙ্ক ভর করেছে।

তিনি আমাকে বললেন, “অ্যাডভোকেট সাহেব, আমার স্বামী আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেননি ঠিক, কিন্তু তার সন্দেহবাতিকতা, প্রতিনিয়ত কথায় কথায় খোঁটা দেওয়া আর অবহেলা, আমাকে মানসিকভাবে শেষ করে দিয়েছে। আমি কোনোভাবেই ওই নরকে ফিরতে চাই না। আদালত কি আমাকে জোর করে পাঠাবে?”

আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, নির্যাতন মানেই কেবল গায়ে হাত তোলা বা মারধর করা। কিন্তু প্রতিনিয়ত যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে একজন মানুষকে যেতে হয়, তাকে সমাজ বা পরিবার প্রায়ই আমলে নিতে চায় না। ফলে, স্বামী যখন মামলা করে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চান, তখন সেই জোরপূর্বক সহাবস্থান মেয়েটির জন্য চরম মানসিক নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আইনগত ব্যাখ্যা ও উচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি:

বাংলাদেশের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন যুগান্তকারী রায় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে বিচারব্যবস্থা মানসিক নির্যাতনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।

মানসিক নিষ্ঠুরতাও (Mental Cruelty) একটি বৈধ গ্রাউন্ড: মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ এবং পারিবারিক আদালতের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, নিষ্ঠুরতা কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও হতে পারে। কোনো স্ত্রী যদি আদালতে প্রমাণ করতে পারেন যে, স্বামীর আচরণ তার তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ, তবে আদালত স্বামীকে দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেবেন না।

মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কারো সাথে থাকতে বাধ্য করা হলে তা তার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং এটি এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক নির্যাতন।

আইন কী বলে বনাম বাস্তবে কী হয় –

আইন কী বলে: আইন পরিষ্কার বলে, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার কোনো যান্ত্রিক আদেশ নয়। আদালত যদি বুঝতে পারেন যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে গেছে এবং একসাথে থাকতে বাধ্য করলে বিবাদীর (বিশেষ করে স্ত্রীর) মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবে আদালত এই মামলা সরাসরি খারিজ করে দিতে পারেন।

বাস্তবে কী হয়: বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, স্বামীরা মামলা জেতার পর মনে করেন তারা আইনিভাবে জিতে গেছেন। কিন্তু স্ত্রী যদি উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং তার মানসিক যন্ত্রণার সপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরতে পারেন, তবে উচ্চ আদালত স্ত্রীর মানসিক নিরাপত্তাকেই প্রাধান্য দেন। জোর করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেয়ে একজন মানুষের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

আপনার জন্য পরামর্শ: একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করবেন। কেননা, আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top