আদালত কি পারে কোনো নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সংসারে পাঠাতে? জোর করে সংসার করার আইনি ব্যাখ্যা আসলে কী?
আমার পেশাগত জীবনে অনেক স্বামীকেই দেখেছি যারা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “অ্যাডভোকেট সাহেব, আমি তো মামলা জিতেছি, এখন পুলিশ দিয়ে আমার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে আসবো না কেন?” অবিশ্বাস্য হলেও এমন কথা আমাকে বেশ কয়েকবার শুনতে হয়েছে।
অন্যদিকে, অনেক নারী এই ভয়ে থাকেন যে, আদালত যদি তার বিরুদ্ধে রায় দেয়, তবে হয়তো তাকে জোড় করে বেঁধে বা পুলিশ পাহারায় স্বামীর ঘরে পাঠানো হবে। এই যে ‘জোর করে ফিরিয়ে আনা’র ধারণা, এটি আমাদের সমাজের একটি বিশাল বড় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে। এই ভয় বা ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সঠিক আইনি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়ে যায়, বিশেষ করে নারীরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। চলুন এ সম্পর্কে আইন কী বলছে, জেনে নেয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা ও আদালত কী করতে পারে?
দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলায় আদালত যদি স্বামীর পক্ষে রায় (ডিক্রি) দেন, তবে তার মানে এই নয় যে, আদালত স্ত্রীকে শারীরিক বলপ্রয়োগ করে ফেরত পাঠাবেন।
১. ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রাধান্য: বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ের রায়ে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পূর্ণবয়স্ক নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো সাথে (এমনকি স্বামীর সাথেও) বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী।
২. ডিক্রি জারির সীমাবদ্ধতা: দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী, এই ধরনের ডিক্রি কার্যকর করার আইনগত উপায় হলো বিবাদীর (স্ত্রী) সম্পত্তি ক্রোক করা বা তাকে দেওয়ানি কারাগারে পাঠানো। তবে বর্তমান বিচারব্যবস্থায় একজন নারীকে সংসার করতে বাধ্য করার জন্য সম্পত্তি ক্রোক করা বা জেলে পাঠানোর কোনো নজির নেই। ফলে, এটা স্পষ্ট যে, একজন নারীকে সংসার করানোর আইনি ডিক্রিও কার্যকর নয়।
আইন কী বলে বনাম বাস্তবে কী হয়:
আইন কী বলে: আইন বলে, স্বামী যদি ডিক্রি পাওয়ার পরও স্ত্রীকে ফেরত না পান, তবে তিনি খোরপোশ বা ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করতে পারেন। অর্থাৎ, স্ত্রী যদি ‘যৌক্তিক কারণ’ ছাড়া স্বামীর আদেশ অমান্য করেন, তবে তিনি আর ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী থাকেন না।
বাস্তবে কী হয়: বাস্তবে এই ডিক্রিটি মূলত একটি ‘ঘোষণামূলক’ হিসেবে কাজ করে। যদি স্ত্রী ফিরে না আসেন, তবে স্বামী এই ডিক্রিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তীকালে খোরপোশ মামলা থেকে রেহাই পেতে পারেন অথবা মোহরানা পরিশোধ সাপেক্ষে তালাকের পথে হাঁটতে পারেন। মোদ্দা কথা, আদালত পথ দেখায়, কিন্তু কাউকে হাতকড়া পরিয়ে সংসারে ফেরত পাঠায় না।
আপনার জন্য পরামর্শ:
মামলা মোকাদ্দমার ক্ষেত্রে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করবেন। কেননা, আইনকানুনগুলো একই হলেও প্রতিটি ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়, তাই এর উপস্থাপনও ভিন্ন হবে। উপরোক্ত আলোচনায় সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।