হেবা ও সাধারণ দানের মূল পার্থক্য কী?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “হেবা ও সাধারণ দানের মূল পার্থক্য কী?” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

সব দানই কি হেবা? রক্তের সম্পর্ক বনাম বাইরের মানুষ: আইনি ভুল ধারণার সহজ সমাধান সবারই জানা দরকার। জমি বা সম্পত্তি দান করা নিয়ে আমাদের সমাজে একটা খুব সাধারণ, কিন্তু তার মাঝেই কিছু মারাত্মক ভুল ধারণা রয়ে গেছে। অনেকেই মনে করেন, কাউকে কোনো সম্পত্তি ভালোবেসে দিয়ে দিলেই সেটা ‘হেবা’ হয়ে গেল!

বাস্তবতা হলো, রক্তের সম্পর্কের বাইরের কোনো আপনজনকে আপনি যখন মুখে বা সাধারণ কাগজে লিখে কিছু দিয়ে দেন, আইনের চোখে তার কোনো মূল্যই নেই। অনেকেই না জেনে লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি রক্তের সম্পর্কের বাইরের মানুষকে সাধারণ ডিক্লারেশন দিয়ে বা কম খরচে রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে পরবর্তীতে জালিয়াতি ও মামলার মুখে পড়েন।

আইনগতভাবে সব দানই কিন্তু হেবা নয়। মুসলিম আইনে ‘হেবা’ এবং সাধারণ ‘দান’ (Gift) এর মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। একজন পারিবারিক আইন চর্চাকারী হিসেবে আজ আপনাদের এই বিভ্রান্তিটি একদম সহজ ভাষায় পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

১. হেবা (Hiba) কী এবং কারা এটি করতে পারেন?

মুসলিম আইন অনুযায়ী, হেবা হলো কোনো প্রতিদান বা বিনিময় ছাড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কাউকে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করা। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আপনি চাইলেই যেকোনো মানুষকে নামমাত্র খরচে ‘হেবা’ করতে পারবেন না।

রক্তের নির্দিষ্ট সম্পর্ক: হেবা মাত্র নির্দিষ্ট কিছু রক্তের সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিল করা যায়। যেমন:

  • স্বামী-স্ত্রী
  • পিতা-মাতা ও সন্তান
  • ভাই-বোন
  • দাদা-দাদী ও নাতি-নাতনি
  • নানা-নানী ও নাতি-নাতনি

সুবিধা: এই নির্দিষ্ট সম্পর্কগুলোর মধ্যে হেবা দলিল করতে সরকারি রেজিস্ট্রেশন খরচ মাত্র ১০০ টাকা (সাথে সামান্য কিছু স্ট্যাম্প ডিউটি ও কোর্ট ফি)।

২. সাধারণ দান (Gift) কী?

যখন আপনি উপরের তালিকার বাইরে অর্থাৎ কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, কোনো প্রতিষ্ঠান বা সম্পূর্ণ বাইরের কোনো মানুষকে ভালোবেসে বা খুশি হয়ে কোনো সম্পত্তি দিতে চান, তখন মুসলিম আইনে সেটাকে আর ‘হেবা’ বলা যাবে না; সেটা হবে সাধারণ দান (Gift)।

খরচ ও নিয়ম: রক্তের সম্পর্কের বাইরের কাউকে দান করতে হলে সম্পত্তির বাজারমূল্য অনুযায়ী সাধারণ দলিলের মতো সমপরিমাণ সরকারি ট্যাক্স, ভ্যাট এবং রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হয়। এখানে নামমাত্র খরচে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

৩. হেবা-বিল-এওয়াজ (Hiba-bil-Iwaj) কী?

অনেকে এই শব্দটির সাথে পরিচিত। হেবা-বিল-এওয়াজ হলো—কোনো কিছুর বিনিময়ে দান। যেমন: কেউ কাউকে একটি পবিত্র কুরআন শরীফ, তসবিহ বা জায়নামাজ উপহার দিল, আর তার বিনিময়ে অপর পক্ষ তাকে এক খণ্ড জমি দান করল।

কোনটার আইনি ভিত্তি বেশি মজবুত?

মনে রাখবেন, আইনি ভিত্তি ‘হেবা’ বা ‘দান’ শব্দের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সঠিক নিয়মে দলিল রেজিস্ট্রেশন এবং দখল হস্তান্তরের ওপর।

১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭এ (Section 17A) অনুযায়ী, হেবা বা দান—যাই হোক না কেন, তা অবশ্যই লিখিত এবং রেজিস্ট্রিভুক্ত হতে হবে। মুখে মুখে বা সাদা কাগজের দানের কোনো আইনি মূল্য নেই। দলিল রেজিস্ট্রির পাশাপাশি সম্পত্তি গ্রহীতাকে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে হবে এবং দ্রুত সরকারি রেকর্ডে নিজের নামে নামজারি (Mutation) করিয়ে নিতে হবে। তবেই তার আইনি ভিত্তি ১০০% মজবুত হবে।

বিশেষ পরামর্শ: রক্তের সম্পর্কের বাইরের কাউকে সম্পত্তি দেওয়ার সময় ভুলেও খরচ বাঁচানোর জন্য ‘হেবা’ বা ‘হেবা-বিল-এওয়াজ’ এর আশ্রয় নিতে যাবেন না। এতে পরবর্তীতে দলিল বাতিলের মামলা হতে পারে। আইনি জটিলতা এড়াতে সঠিক ফি দিয়ে ‘দান দলিল’ (Gift Deed) করুন।

Share the Post:
Scroll to Top