প্রিয় পাঠক, বিয়ে একটি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন হলেও আইনি সুরক্ষার জন্য এর রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিয়ে রেজিস্ট্রির মূল দায়িত্ব কার এবং এটি না করলে কী আইনি জটিলতা হতে পারে, চলুন জেনে নিই।
১. আইনের মূল বিধান: বরের দায়িত্ব
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, মুসলিম বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার প্রাথমিক ও প্রধান আইনি দায়িত্ব হলো বরের (স্বামী)।
আইন অনুযায়ী, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বর পক্ষকেই বিয়েটি নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। যদি বর এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তিনি আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন।
২. বিয়ে কে রেজিস্ট্রি করাবেন এবং কতদিনের মধ্যে?
বিয়ের অনুষ্ঠান যেখানে সম্পন্ন হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে সময়ের কিছু পার্থক্য রয়েছে –
নিকাহ রেজিষ্ট্রার বা কাজীর উপস্থিতিতে বিয়ে হলে: যদি বিয়েটি সরাসরি কাজীর উপস্থিতিতে পড়ানো হয়, তবে কাজীর দায়িত্ব হলো তৎক্ষণাৎ (ওই সময়ই) বিয়েটি রেজিস্ট্রি করা।
কাজী ছাড়া অন্য কারো মাধ্যমে বিয়ে হলে: যদি ঘরোয়াভাবে বা কোনো হুজুর ডেকে বিয়ে পড়ানো হয়, তবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বর পক্ষকে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিষ্ট্রারের (কাজী) অফিসে গিয়ে বিয়েটি রেজিস্ট্রি করাতে হবে।
৩. কনে বা কনে পক্ষের কি কোনো দায়িত্ব আছে?
আইনগতভাবে মূল বাধ্যবাধকতা বরের ওপর থাকলেও, ব্যবহারিক ও সুরক্ষার দিক থেকে কনে এবং কনে পক্ষেরও সচেতন হওয়া জরুরি। কাবিননামা বা নিকাহনামা হলো একজন নারীর বৈবাহিক অধিকারের সবচেয়ে বড় আইনি দলিল। তাই বিয়েটি সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি হচ্ছে কি না এবং কাবিননামার শর্তগুলো (বিশেষ করে ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কি না) ঠিক আছে কি না, তা কনে পক্ষের যাচাই করে নেওয়া উচিত।
৪. বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে কী শাস্তি হয়?
আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রি না করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যদি কোনো বর বা কাজী ইচ্ছাকৃতভাবে বিয়ে রেজিস্ট্রি না করেন বা অবহেলা করেন, তবে আইনে তার জন্য ২ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে মনে রাখা জরুরি, রেজিস্ট্রি না করলেও বিয়েটি ধর্মীয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না, কিন্তু আইনি সুরক্ষার অধিকার নষ্ট হয়।
৫. রেজিস্ট্রি না করার কুফল
বিয়ে রেজিস্ট্রি না থাকলে পরবর্তীতে স্ত্রী তার দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের বৈধতা কিংবা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করতে গিয়ে চরম আইনি জটিলতায় পড়েন। কারণ আদালত সবার আগে ‘কাবিননামা’ বা বিয়ে রেজিস্ট্রির সনদ দেখতে চায়।
সহজ কথায়, মুসলিম বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের আইনি বাধ্যবাধকতা ও দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বরের বা স্বামী পক্ষের। তবে কনে পক্ষের উচিত বিয়ের সময়ই খসড়া কাবিননামা ভালোভাবে দেখে নেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা। এটি কোনো পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় নয়, বরং দুটি পরিবারের ভবিষ্যতের আইনি নিরাপত্তা।