প্রিয় পাঠক, সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক কলহ আমাদের সমাজে নিত্যদিনের চিত্র। অনেক সময় সন্তানরা জীবিত অবস্থাতেই বাবা-মায়ের সম্পত্তির ভাগ চান বা জোরপূর্বক অধিকার দাবি করেন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ধর্মীয় বিধান এই বিষয়ে কী বলে? চলুন পরিষ্কারভাবে জেনে নিই।
১. মূল আইনি নীতি: জীবিত অবস্থায় কোনো অধিকার নেই
বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম ও হিন্দু পারিবারিক আইন এবং সম্পত্তি আইন অনুযায়ী, বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পত্তিতে সন্তানের কোনো প্রকার আইনি অধিকার বা মালিকানা সৃষ্টি হয় না।
আইনের চোখে, একজন ব্যক্তি যতদিন জীবিত আছেন, তিনি তার অর্জিত বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির একক এবং নিরঙ্কুশ মালিক (Absolute Owner)। তিনি তার সম্পত্তি কীভাবে ব্যবহার করবেন, কাকে দেবেন বা বিক্রি করবেন কি না, ইত্যাদি, এটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
২. মুসলিম আইনের দৃষ্টিভঙ্গি: উত্তরাধিকার কেবল মৃত্যুর পর
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (Islamic Law of Inheritance) অনুযায়ী, ‘উত্তরাধিকার’ বা মিরাসের অধিকার কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন সম্পত্তির মূল মালিক মারা যান। বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো সন্তানই বলতে পারেন না যে, “এই সম্পত্তিতে আমার এত অংশ পাওনা আছে।”
বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা কাউকে দান (হেবা) করে দিলে সন্তানরা আইনগতভাবে তাতে কোনো বাধা বা আপত্তি দিতেও পারেন না।
এমনকি বাবা-মা যদি তাদের সমস্ত সম্পত্তি কোনো এক সন্তানকে বা কোনো তৃতীয় পক্ষকে দান করে যান, তবে অন্য সন্তানরা জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর পরেও সেই দানকে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না (যদি না প্রমাণ করা যায় যে সেই দানটি জোরপূর্বক বা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় করানো হয়েছিল)।
৩. হিন্দু আইনের প্রেক্ষাপট ও মিতাক্ষরা বনাম দায়ভাগ
বাংলাদেশের হিন্দুরা মূলত ‘দায়ভাগ’ (Dayabhaga) মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হন। দায়ভাগ আইন অনুযায়ী, সন্তানের জন্ম হলেই সে বাবা-মায়ের সম্পত্তির ওপর কোনো অধিকার পায় না।
বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির পূর্ণ মালিক তিনিই। বাবার মৃত্যুর পরই কেবল ছেলেরা (এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মেয়েরা) সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। অর্থাৎ, হিন্দু আইনেও জীবিত বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে সন্তানের কোনো দাবি খাটে না।
৪. ভরণপোষণ বনাম সম্পত্তির মালিকানা
অনেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারকে সম্পত্তির মালিকানার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। আইন অনুযায়ী, সন্তানেরা অপ্রাপ্তবয়স্ক (ছেলেদের ক্ষেত্রে) বা অবিবাহিত (মেয়েদের ক্ষেত্রে) থাকা পর্যন্ত বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভরণপোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, ইত্যাদি) পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন।
কিন্তু এই ভরণপোষণের অধিকারের মানে এই নয় যে, সন্তানরা বাবা-মায়ের স্থাবর সম্পত্তি (জমি বা ফ্ল্যাট) নিজেদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য জোর করতে পারবেন।
৫. জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল করলে আইনি পরিণতি
যদি কোনো সন্তান বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের অমতে সম্পত্তি দখল করেন, তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন বা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেন:
বাবা-মা চাইলে সেই সন্তানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আদালতেই মামলা করতে পারেন।
পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০ অনুযায়ী এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আদালত চাইলে সন্তানকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার এবং বাবা-মায়ের সুরক্ষার আদেশ দিতে পারেন।
এছাড়া পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, সন্তানরা বাবা-মায়ের যত্ন ও ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। উল্টো বাবা-মায়ের সম্পত্তি দাবি করা এই আইনের পরিপন্থী।
সহজ কথায়, বাবা-মা যতদিন জীবিত আছেন, তাদের সম্পত্তির ওপর সন্তানের অধিকার “শূন্য”। উত্তরাধিকারের হিসাব শুরুই হয় মৃত্যুর পর থেকে। তাই জীবিত অবস্থায় বাবা-মায়ের সম্পত্তি নিজের দাবি করা আইনত ও নৈতিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল। বাবা-মা খুশি হয়ে সন্তানদের যা দেবেন, সন্তানরা কেবল ততটুকুরই অধিকার পাবেন।