পারিবারিক সহিংসতা মানে শুধু শারীরিক আঘাত নয়!

আইন সহায়িকা ব্যানার। “পারিবারিক সহিংসতা মানে শুধু শারীরিক আঘাত নয়!” - এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল

“গায়ে হাত তোলেনি, তাই মুখ বুজে সহ্য করছি” – এই ভুল ধারণা আর কতদিন?

আমাদের সমাজে একটা মস্ত বড় ভুল ধারণা প্রচলিত আছে , পারিবারিক সহিংসতা বা নির্যাতন মানেই হলো নীল হয়ে যাওয়া দাগ, রক্তপাত কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির মানুষ গায়ে হাত না তুললে অনেক নারীই ভাবেন, “আইনি প্রতিকার চাওয়ার বোধহয় কোনো সুযোগ নেই।”

কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে প্রতিনিয়ত এমন অনেক মানুষের মুখোমুখি হই, যারা দিনের পর দিন তীব্র মানসিক ও অর্থনৈতিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, অথচ মুখ ফুটে বলতে পারছেন না; এমনকি কোনটা অপরাধ আর কোনটা আপরাধ নয় সেটাই জানেন না তারা।

আজ আপনাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি তথ্য জানাবো।

‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ অনুযায়ী — পারিবারিক সহিংসতা মানে শুধু শারীরিক আঘাত নয়। এই আইনে স্পষ্ট করে চার ধরনের নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে:

১. মানসিক নির্যাতন: মুখের ভাষা যখন অস্ত্রের চেয়েও ধারালো হয়। প্রতিনিয়ত গালিগালাজ করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, চরিত্র নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, কিংবা এমন কোনো আচরণ করা যা একজন মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়—তা আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২. অর্থনৈতিক ক্ষতি বা নির্যাতন: স্ত্রীকে ঘরকন্নার খরচ বা নিয়মিত ভরণপোষণ না দেওয়া, বাসস্থান বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা একটি বড় অপরাধ। এছাড়া, অনেক কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তার নিজের উপার্জিত টাকা বা বিয়ের যৌতুকের সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয় বা তাকে তার নিজের সম্পদ ভোগ করতে দেওয়া হয় না। এটিও এই আইনের অধীনে মারাত্মক অপরাধ।

৩. যৌন নির্যাতন: পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেও যেকোনো ধরনের অসম্মানজনক বা জোরপূর্বক শারীরিক আচরণ এর অন্তর্ভুক্ত।

৪. শারীরিক নির্যাতন: যেকোনো ধরনের শারীরিক আঘাত বা বলপ্রয়োগ।

আইন কী প্রতিকার দেয়?

অনেকে মনে করেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া মানেই সংসার ভেঙে যাওয়া বা সরাসরি জেলে পাঠানো। বিষয়টি তেমন নয়। এই আইনের বিশেষত্ব হলো, ভুক্তভোগী নারী বা শিশু চাইলে সংসার বজায় রেখেও শুধু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালতের মাধ্যমে ‘সুরক্ষা আদেশ’ (Protection Order) পেতে পারেন। আদালত নির্যাতনকারীকে মানসিক বা অর্থনৈতিক কষ্ট দেওয়া বন্ধ করার কঠোর নির্দেশ দিতে পারেন। আর আদালতের সেই আদেশ অমান্য করলে তখন তা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

আইন প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। তাই লোকলজ্জা বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ভেতরের কান্না ভেতরে চেপে রাখবেন না। মনে রাখবেন, সচেতনতাই সুরক্ষার প্রথম ধাপ।

Share the Post:
Scroll to Top