প্রিয় পাঠক, বিয়ে যেভাবে একটি রাষ্ট্রীয় আইনি চুক্তি এবং তা কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়; ঠিক একইভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাককেও সরকারিভাবে নথিবদ্ধ বা রেজিস্ট্রি করতে হয়। অনেকেই শুধু নোটিশ পাঠিয়েই নিশ্চিন্ত হয়ে যান, যা পরবর্তীতে মারাত্মক আইনি বিপদের কারণ হতে পারে।
১. আইন কী বলে? (১৯৭৪ সালের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন)
বাংলাদেশের প্রচলিত ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’ (The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974) অনুযায়ী- বিয়ে নিবন্ধনের মতোই প্রতিটি তালাকও সরকারি নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
আইনের চোখে শুধু নোটিশ পাঠানো বা ৯০ দিন পার হওয়াই শেষ কথা নয়; বিচ্ছেদ যে চূড়ান্ত হয়েছে, তার সরকারি স্বীকৃতি বা এন্ট্রি কাজীর ভলিউম বইতে থাকতে হবে।
২. তালাক রেজিস্ট্রি কখন এবং কীভাবে করতে হয়?
তালাক ইচ্ছে করলেই প্রথম দিনে কাজী অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করা যায় না। এর একটি নির্দিষ্ট আইনি সময় ও প্রক্রিয়া রয়েছে:
৯০ দিন পর: ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর যে ৯০ দিন সময় থাকে, সেই ৯০ দিন পার হওয়ার পর যখন তালাকটি আইনগতভাবে চূড়ান্ত বা কার্যকর হয়, কেবল তখনই তালাক রেজিস্ট্রি করার আইনি যোগ্যতা তৈরি হয়।
প্রমাণপত্র উপস্থাপন: ৯০ দিন পার হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে একটি ‘তালাক কার্যকরকরণের সনদপত্র’ (Divorce Certificate) বা আপস-মীমাংসা হয়নি মর্মে চূড়ান্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
কাজীর ভলিউমে সই: এই সনদপত্রটি নিয়ে সরকারি নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর অফিসে গিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি করতে হবে এবং কাজীর নির্ধারিত তালাক রেজিস্ট্রি বইতে (ভলিউমে) সই করতে হবে।
৩. তালাক রেজিস্ট্রি না করলে কী কী আইনি বিপদ হতে পারে?
অনেকে ভাবেন, ৯০ দিন তো পার হয়েই গেছে, কাজীকে বাড়তি টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি করার কী দরকার? এই অবহেলার কারণে পরবর্তীতে নিচের ৩টি ভয়ংকর জটিলতা তৈরি হয়:
ক) ২য় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি বাধা (পুনর্বিবাহ): তালাকপ্রাপ্ত স্বামী বা স্ত্রী যখন পরবর্তীতে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে বা অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাবেন, তখন নতুন কাজী অবশ্যই পূর্বের বিয়ের ‘তালাকনামা’ বা ‘তালাকের সার্টিফাইড কপি’ (Divorce Certificate) দেখতে চাইবেন। তালাক রেজিস্ট্রি করা না থাকলে কোনো সরকারি কাজী ২য় বিয়ে রেজিস্ট্রি করবেন না।
খ) বহুবিবাহের মিথ্যা মামলা: তালাক রেজিস্ট্রি না থাকলে প্রথম পক্ষ (বিশেষ করে প্রাক্তন স্বামী) পরবর্তীতে পরকীয়া, ব্যভিচার (দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা) বা বহুবিবাহের মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়ে হয়রানি করতে পারে। আদালতে তখন কাজীর ভলিউমের রেজিস্ট্রি ছাড়া মৌখিক প্রমাণ টিকবে না।
গ) পাসপোর্ট, ভিসা বা আইনি নথিতে জটিলতা: সরকারি নথিপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টে বৈবাহিক অবস্থা ‘বিবাহিত’ থেকে ‘তালাকপ্রাপ্ত’ পরিবর্তন করতে চাইলে কিংবা বিদেশে ইমিগ্রেশনের জন্য কাজীর দেওয়া নিবন্ধিত তালাকনামার সরকারি কপি বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োজন হয়।
৪. তালাক রেজিস্ট্রির খরচ কে দেবে?
আইন অনুযায়ী, যিনি তালাক দিচ্ছেন (স্বামী দিলে স্বামী, আর ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী দিলে স্ত্রী) তিনিই কাজীর নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি করার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করবেন। তবে যেকোনো এক পক্ষ রেজিস্ট্রি করলেই তা সরকারি ভলিউমে নথিভুক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে অপর পক্ষ চাইলে কাজীর কাছ থেকে এর সার্টিফাইড কপি বা নকল তুলে নিতে পারেন।
সহজ কথায়, বিয়ে যেমন রেজিস্ট্রি ছাড়া পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি পায় না, তেমনি তালাকও রেজিস্ট্রি না করা পর্যন্ত আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি দেয় না। নোটিশ জারির ৯০ দিন পার হওয়ার পর অবশ্যই স্থানীয় কাজী অফিসে গিয়ে সরকারি ফি দিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করুন এবং নিজের নামের ‘তালাকনামা’ বা ডিভোর্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে সুরক্ষিত রাখুন। এটি আপনার ভবিষ্যৎ জীবনের আইনি ঢাল।