প্রিয় পাঠক, বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ পাঠানো এবং তা কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় আইনের সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলে, এখানে অপর পক্ষের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর কোনো কিছু নির্ভর করে না। চলুন ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৭ ধারা অনুযায়ী এর পেছনের আইনি সত্যটি উন্মোচন করি।
১. আইনের মূল নীতি: নোটিশ পাঠানোই যথেষ্ট, গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়
আইন অনুযায়ী, যে পক্ষ (স্বামী বা কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতাবলে স্ত্রী) তালাক দিতে চান, তার দায়িত্ব হলো নিয়ম মেনে লিখিত নোটিশটি তৈরি করে সঠিক ঠিকানায় প্রেরণ করা।
আপনি যখন রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (Registered Post with A/D) সঠিক ঠিকানায় নোটিশটি পাঠিয়ে দেবেন এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়র কার্যালয়ে এর একটি কপি জমা দেবেন, তখন আপনার আইনি দায়িত্ব শেষ। অপর পক্ষ সেই চিঠিটি হাত দিয়ে গ্রহণ করল কি না, কিংবা পিয়নের সামনে থেকে চিঠিটি ফিরিয়ে দিল কি না- আইনের চোখে তার কোনো গুরুত্ব নেই।
ডাকবিভাগের “গ্রহণে অস্বীকৃতি” (Refused) বা “খুঁজে পাওয়া যায়নি” (Not Found) লেখা সংবলিত ফেরত আসা রসিদই আদালতে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে আপনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।
২. ৯০ দিনের স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি (The 90-Day Rule)
চেয়ারম্যান বা মেয়র কার্যালয়ে তালাকের নোটিশটি যেদিন পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই আইনানুযায়ী ৯০ দিন (তিন মাস)-এর কাউন্টডাউন বা সময় গণনা শুরু হয়ে যায়। এই ৯০ দিনের মধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যানের অধীনে একটি ‘সালিসি পরিষদ’ গঠন করা হয় এবং উভয় পক্ষকে আপস-মীমাংসার জন্য ডাকা হয়।
এখন অপর পক্ষ যদি ডিভোর্স লেটার গ্রহণ না করার বাহানা করে সালিসি বৈঠকে উপস্থিত না হন, তবে সালিশি পরিষদ একতরফাভাবেই কাজ চালিয়ে যাবে।
নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ঠিক ৯০ দিন পার হওয়ার সাথে সাথেই তালাকটি আইনগতভাবে চূড়ান্ত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর (Automatically Effective) হয়ে যাবে। চিঠি গ্রহণ না করে তালাক ঠেকানোর কোনো সুযোগ আইনে নেই।
৩. ঠিকানা পরিবর্তনের জালিয়াতি ও স্ত্রীর সুরক্ষা
অনেক সময় কিছু অসৎ স্বামী বা স্ত্রী ইচ্ছে করেই অপর পক্ষকে হয়রানি করার জন্য কাবিননামায় থাকা স্থায়ী ঠিকানা বা বাপের বাড়ির সঠিক ঠিকানা বদলে সম্পূর্ণ ভুল বা ভুয়া ঠিকানায় নোটিশ পাঠান, যাতে অপর পক্ষ জানতেও না পারে এবং গোপনে ৯০ দিন পার হয়ে তালাক হয়ে যায়।
আইনি সুরক্ষা: যদি প্রমাণিত হয় যে নোটিশটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল এবং ভুক্তভোগী পক্ষ আসলেই কোনো নোটিশ পাননি, তবে সেই তালাক আইনের চোখে অবৈধ এবং অকার্যকর হবে।
প্রতিকার: ভুক্তভোগী পক্ষ পরবর্তীতে আদালতে মামলা করে সেই একতরফা জালিয়াতির তালাক বাতিল করতে পারেন। তাই আইন অনুযায়ী নোটিশটি সবসময় “সর্বশেষ সঠিক ও ব্যবহৃত ঠিকানায়” পাঠানো বাধ্যতামূলক।
৪. নোটিশ ছিঁড়ে ফেললে বা সই না করলে কী হয়?
অনেকে রাগের মাথায় কাজীর বা ডাকবিভাগের পিয়নের সামনেই ডিভোর্স লেটার ছিঁড়ে ফেলেন বা রিসিভ কপিতে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। মনে রাখবেন, এটি কেবল একটি মানসিক সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়াকে এক সেকেন্ডের জন্যও থামাতে পারে না। কাজীর ভলিউমে বা পোস্ট অফিসের খাতায় “নোটিশ জারি হয়েছে” এই মর্মে প্রমাণ থাকলেই তা আইনত বৈধ।
সহজ কথায়, ডিভোর্স লেটার গ্রহণ না করা, লুকিয়ে রাখা বা সই না করার মাধ্যমে তালাক বন্ধ করা যায় না। এটি কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয় যে দুই পক্ষের সই লাগবে; এটি একটি একতরফা আইনি ঘোষণা, যা রাষ্ট্র নির্ধারিত নিয়মে নোটিশ জারির ৯০ দিন পর নিজে নিজেই কার্যকর হয়। তাই নোটিশ পেলে তা প্রত্যাখ্যান না করে, দ্রুত একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে সালিশি পরিষদে নিজের অধিকার (যেমন: দেনমোহর ও খোরপোশ) আদায়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।