দেনমোহর পরিশোধের প্রমাণ রাখতে হয় কীভাবে?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “দেনমোহর পরিশোধের প্রমাণ রাখতে হয় কীভাবে?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, দেনমোহর পরিশোধ করাই শেষ কথা নয়, আইনের কাঠগড়ায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সেই পরিশোধের সঠিক দলিল বা ট্রেইল রাখা বাধ্যতামূলক। মৌখিক সম্মতির কোনো আইনি মূল্য নেই।

মনে রাখবেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রমাণ রাখার বিষয়টি হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু যখনই জটিলতা তৈরি হয়, তখনই তা প্রমাণ আর আইনের প্রশ্ন হয়ে যায়। ভবিষ্যতে যেকোনো জটিলতা এড়াতে নিচে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা উচিত:

১. কাবিননামার ১৩ থেকে ১৬ নম্বর কলামে অন্তর্ভুক্তি (বিয়ের সময়)
বিয়ের মজলিশেই যদি দেনমোহরের আংশিক বা সম্পূর্ণ অংশ (যেমন: নগদ টাকা বা অলংকার) পরিশোধ করা হয়, তবে তা প্রমাণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সরকারি কাবিননামা বা নিকাহনামা।

কাবিননামার ১৩ থেকে ১৬ নম্বর কলামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে— “এত ভরি স্বর্ণালংকার (যার মূল্য এত টাকা) অথবা নগদ এত টাকা দেনমোহরের ‘উসুল’ বা আংশিক পরিশোধ হিসেবে স্ত্রীকে প্রদান করা হলো এবং স্ত্রী তা বুঝে পেলেন।”

কলামটি খালি রাখলে বা সাধারণ ‘উপহার’ হিসেবে মৌখিকভাবে দিলে পরবর্তীতে তা দেনমোহর হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।

২. ব্যাংক ট্রান্সফার বা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ (সবচেয়ে নিরাপদ)
বিয়ের পর সংসার চলাকালীন সময়ে স্বামী যদি স্ত্রীকে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে চান, তবে নগদ (Cash) টাকা না দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: স্ত্রীর নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকাটি ট্রান্সফার (Online Transfer/EFT) করতে পারেন।

চেক (Cheque): স্ত্রীর নামে অ্যাকাউন্ট পেয়ী (Account Payee) চেক দিতে পারেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: টাকা পাঠানোর সময় ব্যাংকের ডিপোজিট স্লিপ, অনলাইন ট্রান্সফারের ‘Remarks/Purpose’ কলামে অথবা চেকের পেছনে স্পষ্ট করে লিখে দিতে হবে: “দেনমোহর বাবদ পরিশোধ” (Payment for Dower/Denzmohor)। এই ব্যাংকিং স্টেটমেন্ট আদালতে একক ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়।

এছাড়া, দেনমোহর পরিশোধের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সম্প্রতি চালু করা ‘মোহর একাউন্ট’ দারুণ সমাধান হতে পারে।

৩. লিখিত রসিদ বা ডিক্লারেশন (Money Receipt)
যদি কোনো কারণে নগদ টাকা বা গহনা দিতেই হয়, তবে স্ত্রী টাকা বা অলংকার বুঝে পাওয়ার পর তার কাছ থেকে একটি লিখিত রসিদ বা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র (Acknowledgment Receipt) নিয়ে রাখতে হবে।

একটি সাদা কাগজে বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্ত্রী লিখিতভাবে উল্লেখ করবেন যে— “আমি আমার স্বামী [স্বামীর নাম]-এর কাছ থেকে আমার দেনমোহর বাবদ নগদ এত টাকা বা এত ভরি গহনা সম্পূর্ণ বুঝে পেলাম। আমার দেনমোহর বাবদ আর কোনো দাবি রইল না।”

এই রসিদের নিচে স্ত্রীর স্পষ্ট স্বাক্ষর বা টিপসই থাকতে হবে এবং ন্যূনতম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর (সম্ভব হলে স্ত্রীর পরিবারের কেউ) স্বাক্ষর ও আইডি নম্বর রাখতে হবে।

৪. নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ‘হলফনামা’ (Affidavit)
সংসার চলাকালীন সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ হয়ে গেলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই স্থানীয় একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত হয়ে একটি যৌক্তিকভাবে সম্পাদিত হলফনামা (Affidavit of Dower Satisfaction) তৈরি করে রাখতে পারেন।

এখানে স্ত্রী সরকারি স্ট্যাম্পে আইনগত ঘোষণা দেন যে তার দেনমোহরের ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দেওয়ানি দলিল।

৫. বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ বা আপসনামায় উল্লেখ
যদি কোনো কারণে সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং সালিসি পরিষদের মাধ্যমে বা আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসা (Mutual Settlement) হয়:

বিচ্ছেদের চুক্তিনামায় বা আপসনামায় (Settlement Deed) স্পষ্টভাবে লিখতে হবে যে, বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার আগেই স্ত্রী তার দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা বুঝে পেয়েছেন এবং কাজী অফিসে রেজিস্ট্রির সময় কাজীর ভলিউমেও ‘উসুল’ হিসেবে তা স্বাক্ষর করিয়ে নিতে হবে।

আইনি সতর্কতা: আমাদের সমাজে অনেক স্বামী ভাবেন স্ত্রীকে প্রতি মাসে হাতখরচ দিলে বা ঈদে দামি শাড়ি-গহনা কিনে দিলেই বুঝি দেনমোহর শোধ হয়ে যায়। আইন কিন্তু তা বলে না। আপনি স্ত্রীকে ভালোবেসে যা দিচ্ছেন, তা আইনি ভাষায় ‘উপহার’ (Gift)। উপহার কখনো ‘দেনমোহর’ বা ঋণের বিকল্প হতে পারে না, যদি না স্ত্রী তা লিখিতভাবে দেনমোহর হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হন। তাই লেনদেনের উদ্দেশ্য (Purpose) কাগজে-কলমে স্পষ্ট রাখা জরুরি।

মনে রাখবেন, দেনমোহর প্রদানের প্রমাণ সংরক্ষণের নানা উপায়ের মধ্যে উপরোক্ত উপায়গুলো ছাড়াও আরো বিভিন্ন উপায় রয়েছে। সেগুলোও প্রয়োগ করা যেতে পারে। আইন জানুন, সঠিক নথিপত্র নিজ দায়িত্বে সংগ্রহে রাখুন।

Share the Post:
Scroll to Top