পরকীয়া করে গোপনে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে। স্ত্রী কি বিয়েটি বাতিল চাইতে পারেন?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “পরকীয়া করে গোপনে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে। স্ত্রী কি বিয়েটি বাতিল চাইতে পারেন?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, গতকালের প্রশ্নের উত্তর আজ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি। স্বামী গোপনে পরকীয়া করে ২য় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী তীব্র ক্ষোভ ও বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম স্ত্রীর মনে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, “আমি কি এই ২য় বিয়েটি আইনিভাবে বাতিল করতে পারি?” চলুন বাংলাদেশের আইন কী বলে তা জেনে নিই।

১. ২য় বিয়েটি কি বাতিল করা সম্ভব?
আইনের সরাসরি উত্তর হলো- না, প্রথম স্ত্রী চাইলেই স্বামীর ২য় বিয়েটি সরাসরি ‘বাতিল’ বা ‘অবৈধ’ ঘোষণা করতে পারেন না।

মুসলিম পারিবারিক আইন এবং শরিয়াহ বিধান অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী বহাল থাকা অবস্থায় সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া ২য় বিয়ে করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও, ২য় বিয়েটি কিন্তু ধর্মীয় ও আইনিভাবে বাতিল বা অবৈধ (Void) হয়ে যায় না। ২য় স্ত্রী যদি প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং ধর্মীয় রীতি (ইজাব-কবুল ও সাক্ষী) মেনে বিয়ে সম্পন্ন হয়, তবে ২য় বিয়েটি বৈধ চুক্তি হিসেবে টিকে থাকে।

২. তাহলে প্রথম স্ত্রী কী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন?
প্রথম স্ত্রী ২য় বিয়েটি বাতিল করতে না পারলেও, আইন তাকে এমন কিছু শক্তিশালী অস্ত্র দিয়েছে যার মাধ্যমে তিনি স্বামীকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে পারেন এবং নিজের অধিকার আদায় করতে পারেন।

ক) স্বামীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা (জেল ও জরিমানা):
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতে ২য় বিয়ে করতে হলে স্থানীয় ‘সালিসি পরিষদের’ লিখিত পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। স্বামী যদি পরকীয়া করে গোপনে ২য় বিয়ে করেন, তবে তিনি আইন লঙ্ঘন করেছেন। প্রথম স্ত্রী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। এই অপরাধের জন্য স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

খ) সম্পূর্ণ দেনমোহর একসাথে এককালীন দাবি:
আইন অনুযায়ী, স্বামী গোপনে ২য় বিয়ে করার সাথে সাথেই প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর (তা তাৎক্ষণিক বা বিলম্বিত যাই হোক না কেন) পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে তার সম্পূর্ণ দেনমোহর এককালীন আদায় করতে পারবেন এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য।

গ) বিবাহ বিচ্ছেদের (তালাক) অধিকার:
যদি স্বামী গোপনে ২য় বিয়ে করেন, তবে সেটি প্রথম স্ত্রীর জন্য একটি আইনি কারণ হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী, স্বামী প্রচলিত আইন অমান্য করে ২য় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে বিবাহ বিচ্ছেদ বা ডিক্রি চাইতে পারেন। আর কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া থাকে, তবে তিনি নিজেই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন।

ঘ) পৃথক ভরণপোষণ বা খোরপোশ:
স্বামী ২য় বিয়ে করার পর প্রথম স্ত্রী যদি তার সাথে একই ছাদের নিচে থাকতে না চান, তবে তিনি আলাদা থেকেও স্বামীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক ভরণপোষণ বা খোরপোশ আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। ২য় বিয়ে করার কারণে আলাদা থাকলেও স্বামী প্রথম স্ত্রীকে খোরপোশ দিতে বাধ্য।

৩. ২য় স্ত্রীর অধিকার ও বাস্তবতা
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো, যেহেতু ২য় বিয়েটি বাতিল হয় না, তাই ২য় স্ত্রীও প্রথম স্ত্রীর মতোই স্বামীর সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারী হন এবং নিজের দেনমোহর ও ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে স্বামী যদি প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে ২য় স্ত্রীকে বিয়ে করে থাকেন, তবে ২য় স্ত্রীও স্বামীর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার’ (দণ্ডবিধি ৪২০ ধারাসহ অন্যান্য ধারায়) মামলা করতে পারেন।

সহজ কথায়, স্বামী গোপনে ২য় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী সেই বিয়েটি ভেঙে দিতে বা বাতিল করতে পারেন না। তবে তিনি আইনগতভাবে স্বামীকে জেলের ভাত খাওয়াতে পারেন, নিজের সম্পূর্ণ দেনমোহর এককালীন আদায় করতে পারেন এবং আলাদা থেকে খোরপোশ দাবি করতে পারেন কিংবা চাইলে বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারেন। আইন তাকে বিয়ে বাতিলের ক্ষমতা না দিলেও, নিজেকে সুরক্ষিত করার এবং স্বামীকে শাস্তি দেওয়ার সব পথ খোলা রেখেছে।

Share the Post:
Scroll to Top