বাংলাদেশের আইনে কোন স্বামী কি ইচ্ছে হলেই স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে?

আইন সহায়িকা ব্যানার। “বাংলাদেশের আইনে কোন স্বামী কি ইচ্ছে হলেই স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে?” এ বিষয়ে আইনি আলোচনার কথা উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল এবং নিচে তার নাম ও যোগাযোগের নম্বর রয়েছে।

প্রিয় পাঠক,
বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের অধিকারকে আমাদের সমাজে যতটা সহজ ভাবা হয়, বর্তমান রাষ্ট্রীয় আইন কিন্তু একে ততটা সহজ রাখেনি। স্বামী চাইলেই ইচ্ছেমতো হুট করে তালাক কার্যকর করতে পারেন না।

১. ইচ্ছার ওপর আইনি লাগাম: ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ
তাত্ত্বিকভাবে মুসলিম পারিবারিক আইনে একজন পুরুষকে একতরফা তালাক দেওয়ার অধিকার (তালাক-ই-আহসান বা হাসান) দেওয়া হলেও, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র এই অধিকারের ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তবে তার ইচ্ছে বা মুখের কথাই শেষ কথা নয়। তাকে বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে স্ত্রীকে তাড়িয়ে দিলে বা মুখে তালাক বললে তা আইনের চোখে অপরাধ।

২. তালাক দিতে হলে যে ৩টি আইনি ধাপ বাধ্যতামূলক
একজন স্বামী ইচ্ছে করলেই সাথে সাথে তালাক কার্যকর করতে পারেন না। তাকে ক্রমান্বয়ে নিচের ধাপগুলো পার হতে হবে:

লিখিত নোটিশ জারি: স্বামীকে প্রথমে একটি লিখিত তালাকের নোটিশ তৈরি করতে হবে।

চেয়ারম্যানকে অবহিতকরণ: সেই নোটিশের একটি কপি স্বামীর বর্তমান বা স্ত্রীর সর্বশেষ বাসস্থান এলাকার স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান, মেয়র বা কাউন্সিলর কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।

স্ত্রীকে অনুলিপি প্রদান: ঠিক একই নোটিশের আরেকটি কপি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা সরাসরি স্ত্রীকে পাঠাতে হবে।

এই নোটিশটি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যেদিন পৌঁছাবে, সেদিন থেকে আইনানুযায়ী ৯০ দিন (তিন মাস) সময় গণনা শুরু হবে। এই ৯০ দিন পার হওয়ার আগে কোনোভাবেই তালাক কার্যকর হবে না।

৩. সালিসি পরিষদ ও আপস-মীমাংসার বাধ্যবাধকতা
নোটিশ পাওয়ার পর স্থানীয় চেয়ারম্যান বা মেয়র চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। আইনের নির্দেশ হলো, তিনি উভয় পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি সালিসি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন।

এই পরিষদের মূল কাজ হলো পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি বা বিরোধ দূর করে সংসারটি টিকিয়ে রাখার জন্য আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা।

যদি স্বামী এই ৯০ দিনের মধ্যে তার ভুল বুঝতে পারেন, তবে তিনি যেকোনো সময় তালাকের নোটিশটি প্রত্যাহার (Withdraw) করে নিতে পারেন। নোটিশ প্রত্যাহার করলে বিয়েটি আগের মতোই বহাল থাকবে।

৪. দেনমোহর ও খোরপোশের কঠোর বাধ্যবাধকতা
স্বামী ইচ্ছে করলেই তালাক দিতে পারেন না, কারণ তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথেই তার ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় চেপে বসে।

তালাকের নোটিশ দেওয়ার সাথে সাথে কাবিননামার সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর (তা তাৎক্ষণিক বা বিলম্বিত যাই হোক না কেন) স্ত্রীকে এককালীন পরিশোধ করতে হবে।

নোটিশ পিরিয়ডের এই ৯০ দিন (ইদ্দতকাল) এবং স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর সম্পূর্ণ ভরণপোষণ বা খোরপোশ স্বামীকে দিতে হবে।

দেনমোহর ও খোরপোশ না দিয়ে তালাক দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে স্বামীর সম্পত্তি ক্রোক করিয়ে এই পাওনা আদায় করতে পারেন।

৫. নোটিশ ছাড়া একতরফা তালাকের আইনি শাস্তি
যদি কোনো স্বামী এই আইনি প্রক্রিয়া বা নোটিশের নিয়ম অমান্য করে স্ত্রীকে মুখে তালাক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেন বা গোপনে কোনো ভুয়া কাগজ তৈরি করেন:

আইনের চোখে সেই তালাক সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং তারা আগের মতোই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন।

আইন অমান্য করে নোটিশ না দেওয়ার অপরাধে স্বামীর ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

সহজ কথায়, বাংলাদেশের আইনে কোনো স্বামী “ইচ্ছে হলেই” হুট করে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিতে পারেন না। তাকে রাষ্ট্রীয় আইন, স্থানীয় সালিসি পরিষদ এবং ৯০ দিনের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একই সাথে দেনমোহর ও খোরপোশ পরিশোধের বড় আর্থিক দায়ভারও নিতে হয়। আইন মূলত তালাকের প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে যাতে হুট করে একটি সুন্দর সংসার ভেঙে না যায়।

Share the Post:
Scroll to Top